বিএনপির ধর্ম অবমাননা? ইসলামে ৪ বিয়ে সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা?
বিএনপির ধর্ম অবমাননা? ইসলামে ৪ বিয়ে সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা? একজন পুরুষের ক্ষেত্রে ৪ টি বিবাহ করা যাবে, এই অনুমতি কি আমাদের বোনেরা আপনাদের দিয়েছে। এই সমাজ ব্যবস্থা আমরা চাইনা। এই সমাজ ব্যবস্থায় তাদের কোনো জায়গাও দিতে চাইনা। এমনই একটি বিতর্কমুলক বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত হয়েছেন, বিএনপির ঢাকা – ১৪ আসনের মনোনিত সংসদ সদস্য সানজিদা হক তুলি।
তার এই বক্তব্য ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ মুসলিম এই বক্তব্য কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। অনেকে বলছেন এটি স্পষ্ট কোরআনের বিধিবিধান অস্বীকার করা। তিনি এই বক্তব্য দিয়ে কোরআনের বাণি অস্বীকার করেছেন। অনেকে তো বলছেন, তিনি এই বক্তব্য দেবার পরে আর মুসলমান নেই।
বিএনপি ক্ষমতায় যাবার লোভে ও জামায়াতে ইসলামীর ভুল ধরতে গিয়ে, ইসলাম কে অস্বীকার করেছেন। আসলেই কি তাই? আসলেই কি তিনি আর মুসলিম আছেন? সত্যিই কি তিনি কোরআনের আয়াত অস্বীকার করেছেন। সাথে আসল বিষয়টি কি কোরআন হাদিস অনুযায়ি সবকিছু বিস্তারিত জানাবো –

তাই কেউ যদি ভুল করে, বিএনপি, নাস্তিক, বা শাহাবাগী এই নিউজটি পড়ছেন তারা, বেরিয়ে যান! সাথে যারা ইসলাম কে অন্ধভাবে অনুসরণ করেন। ইসলামের প্রকৃত জ্ঞান সম্পর্কে অবগত না হতে চান তাহলে আপনারাও এই নিউজটি দেখা বা পড়া থেকে বিরত থাকেন।
আসলে ঘটনাটি ঘটেছে, ঢাকা ১৪ আসনের বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য সানজিদা হক তুলির একটি নির্বাচনীয় প্রচারণায়। যেহেতু বর্তমানে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম। এজন্য বিএনপির প্রত্যেক নির্বাচনী প্রচারণায় জামাত কে টার্গেট করে বক্তব্য দিচ্ছে বিএনপির প্রার্থীরা।
তিনি বলেন, একদল বলছে – ক্ষমতায় আসলে মেয়েদের দিনে ৮ ঘন্টা কাজ থেকে ৫ ঘন্টায় নিয়ে আশা হবে। বাহ! কি চমৎকার চিন্তা ভাবনা। কোথায়, বাংলাদেশের মেয়েদের আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে তা নয়, সবসময় মেয়েদের পিছিয়ে নেবার চেষ্টা।
উল্লেখিত, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের আমির, ডক্টর শফিউর রহমান। এই বক্তব্য কিছুদিন আগেই জামায়াতে ইসলামীর একটি সভায় দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন আমরা ক্ষমতায় গেলে মেয়েদের ৫ ঘন্টা কাজ করার অনুমতি দিবো।

এই বক্তৃতা ভাইরাল হবার পর জামায়াতে আমির আবারো ওই বক্তৃতা সম্পর্কে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন আমারা পরিবার প্রথা ভাঙতে দেবো না। একটি দেশ টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় ভুমিকা পালন করে পরিবার। যদি মেয়েরা ৮ ঘন্টা চাকরি করে তাহলে সংসার সামলাবে কে?
এজন্য তাদের ৫ ঘন্টা কাজ করানো হবে। কিন্তু ৫ ঘন্টা কাজ করলেও তারা ৮ ঘন্টার পারিশ্রমিক পাবে। আর সরকারি হোক অথবা বেসরকারি সবক্ষেত্রেই তাদের ৫ ঘন্টা চাকরি করিয়ে ৮ ঘন্টার বেতন দেওয়া হবে।
আর বাকি ৩ ঘন্টার টাকা কোম্পানির মালিকদের সরকার দেবে। সাথে ওই তিন ঘন্টা কর্মঘন্টা পুর্ণ করবার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে। যেমন মেয়েদেে তিন ঘন্টার পার্ট টাইম জব দেওয়া হবে। ৫ ঘন্টা কাজ করলে সম্পুর্ণ বেতন আর ৩ ঘন্টা করলে হাফ বেতন। এতে আরো কর্মসংস্থান বাড়বে। নারীদের চাকরি ক্ষেত্রে সুযোগ সুবিধা বাড়বে। নারীরা বেকার থাকবেনা। সাথে সংসারও ভালো চলবে।
জামায়াতে আমিরের ওই বক্তব্যকে কটুক্তি করেই মুলত বিএনপির, ঢাকা ১৪ আসনের মনোনীত সংসদ প্রার্থী সানজিদা হক তুলি বক্তৃতা দেন। এতদূর তো সবকিছু অনুকূলেই ছিলো।

কিন্তু তারপরেই, তিনি সবচেয়ে সমালোচিত বক্তব্য প্রদান করেন, তিনি বলেন, একজন পুরুষের ক্ষেত্রে ৪ টি বিবাহ করা যাবে, এই অনুমতি কি আমাদের বোনেরা আপনাদের দিয়েছে। এই সমাজ ব্যবস্থা আমরা চাইনা। আর এই অংশ টুকু সেই আকারে সোসিয়াল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।
এখন আসুন কোরআনে চারটি বিবাহ সম্পর্কে কি বলছে – তা জানি।
সূরা নিসা (৪:৩)
“যদি তোমরা (ওয়ারিশদের জন্য) অনাথ মেয়েদের নিয়ে ভয়ও অভাব অনুভব কর, তাহলে তোমরা অন্য মেয়েদের বিয়ে করো -দুই, তিন, চার পর্যন্ত -কিন্তু যদি ন্যায়বিচার করতে না পারো, তবে শুধু একজনই।”
এখানে চার বিয়ে করার অনুমতি আছে ঠিকই কিন্তু , আদেশ নয়। সাথে ন্যায়বিচার করার কঠিন শর্ত দেওয়া হয়েছে। যদি ন্যায়বিচার করা সম্ভব না হয়, তবে একজন কে বিয়ে করায় সঠিক তার থেকে অধিক নয়। কিন্তু ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতাই মানুষের মধ্যে চারটি বিবাহ যে করাই যাবে সেটি প্রতিস্থাপন করেছে।
সূরা নিসা (৪:১২৯)
“তুমি স্ত্রীর প্রতি সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে তাদের সঙ্গে চেষ্টা করো।”
কোরআন স্বীকার করেছে, পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করা প্রায় অসম্ভব। তাই, এক বিয়ের পথই সবচেয়ে নিরাপদ। আর যদি কোনো সমস্যা বা পরিস্থিতির স্বীকার না হয়। তাহলে একটি বিয়ে করা উচিত।

চারটি পর্যন্ত বিবাহ করার অনুমতি দিয়েছে বলে লাফিয়ে লাফিয়ে বিয়ে করলে হবেনা। একাধিক বিয়ে করার পেছনে যে মহান আল্লাহ তায়ালা কঠিন শর্ত দিয়েছে, তা কিছু কিছু মুসলমান খেয়ালই করেনা। সাধারণ মুসলিম তো দূরে যাক, হুজুর শ্রেণির মানুষই একাধিক বিয়ে করে।
অনেকেই একাধিক বিয়ে করা সুন্নত মনে করে। কিন্তু প্রত্যেক সুন্নত যে, আপনার দ্বারা পালন করা সম্ভব হবে। এটা কে বলেছেন? নবির সাথে একজন সাধারণ মানুষের তুলনা হয়না।নবীজি একাধিক বিয়ে করেছেন অনেক কারণে।
আপনার যদি তেমন পরিস্থিতি বা কারণ না থাকে তাহলে আপনি কেন একাধিক বিয়ে করবেন। কিন্তু আমাদের যথাসম্ভব নবিজির সুন্নত পালন করা উচিত।
আর বর্তমান যুগে বিশেষ করে বাংলাদেশে একাধিক বিয়ে করা রীতি মত পাপের কাজ। কারণ অনেকেই জানেন তারপরেও বলি।

বাংলাদেশের মেয়েরা তার স্বামীকে ভাগ করতে চাইনা। যদি স্বামী বিয়ে করে তাহলে অধিকাংশ নারীই অনেক কষ্ট পায়। আর স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া আল্লাহ তায়ালা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
একাধিক বিয়ে করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ন্যায়বিচার।
‘তোমরা ন্যায়বিচার করতে পারলে…”(সূরা নিসা 4:3)
এবং আল্লাহ বলেছেন:
“তোমরা কখনোই স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না।”(সূরা নিসা 4:129)
এর অর্থ : ন্যায়বিচার করা অনেক কঠিন বিষয়
তাই দ্বিতীয় বিয়ে করলে গুনাহে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু ইসলাম আমাদের সমাজে এমনভাবে প্রচলিত হয়েছে যে, আমরা একাধিক বিয়ে করা যে, আল্লাহর নিয়ম এভাবে বিশ্বাস করি। কিন্তু বিষয়টি ঠিক তেমনটি নয়।
আবার যদি দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রী কষ্টে ভেঙে পড়ে? তাহলে কি হবে। বাংলাদেশে একাধিক বিয়ে করা সবচেয়ে কঠিন এইজন্য। স্ত্রী কষ্টে ভেঙে পড়ে। স্বামীকে বিশ্বাস ঘাতক মনে করে। আর এবিষয়ে রাসুল বলেছেন:
মুমিনদের মধ্যে কারো কষ্ট দিলে আল্লাহ তোমাকে কষ্ট দেবেন। তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সে, যে তার স্ত্রীর প্রতি উত্তম আচরণ করে। যদি আপনি জানেন একাধিক বিয়ে করলে আপনার স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে, সংসার নষ্ট হবে, স্ত্রীর নিরাপত্তা কমে যাবে, সম্পর্ক বিষাক্ত হবে, সন্তানরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাহলে দ্বিতীয় বিয়ে করা ধর্মীয়ভাবে অনুচিত হয়ে যায়।
এ-সব প্রমাণ দ্বারা বলা যায়। বিএনপির ঢাকা ১৪ আসনের মনোনীত সংসদ প্রার্থী সানজিদা হক তুলি ইসলাম সম্পর্কে না জেনেই এমন বিতর্ক মুলক বক্তব্য দিয়েছেন। আসলে তিনি হয়তো কোরআন হাদিস কোনোদিন পড়েইনি।

আর একটি প্রধান কারণ – ইসলাম কে আমাদের কিছু কিছু ইসলামী পন্ডিতেরা এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে। আমরা ইসলামিক বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তো জানি কিন্তু সেটি পালন করা যে কতটা কঠিন বা এর পেছনে কি কি নিষেধ রয়েছে সে সম্পর্কে অজ্ঞ থাকি।
অন্য ধর্মের মানুষ তো দুরে যাক, নিজের ধর্মের মানুষই ইসলাম কে ভুল বোঝে। কারণ তারা ইসলামের প্রকৃত জ্ঞান সম্পর্কে অবগত নয়। কোরআন সম্পুর্ণ একটি জীবনবিধান। সম্পুর্ণ সঠিক। কোরআনে এমন কোনো বিষয় নেই, যেটা আপনার মনে সন্দেহ জাগাবে পারে।
তখনই আপনার মনে সন্দেহ জাগবে,যখন আপনি ইসলাম সম্পর্কে না জেনে বা কোরআন না পড়ে । অন্য মানুষের কথায় ইসলাম কে বিচার করবেন। তাই ইসলাম সম্পর্কে কোনো বক্তব্য দেবার আগে কোরআন ভালো করে পড়তে হবে। বিশেষ করে বাংলা অনুবাদ সহ। যাতে আপনি কোরআনের আসল উদ্দেশ্য জানতে পারেন।
আবার, মেয়েদের পাঁচ ঘন্টা কাজ করানোর কথা বলেছেন – জামায়াতে আমির। কিন্তু তিনি এই কথা বলেছেন, মেয়েদের ভালোর জন্যই কিন্তু ইসলামে কোনো জায়গায় মেয়েদের ৫ ঘন্টা কাজ করবার কথা বলেনি। এমনকি মেয়েরা কাজ করবে না, ব্যবসা করবে না। এগুলো ইসলাম বলে না।
এগুলো তালেবান সহ বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে বলে থাকেন। কিন্তু সেটা আসল ইসলাম না। আমাদের নবিজির স্ত্রী, খাদিজা রা ছিলেন তৎকালীন সময় আরবের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ীর মধ্যে অন্যতম। নবিজি প্রথমে তার হয়ে কাজ করতেন।

তাহলে এ-সব প্রমাণ দ্বারা, প্রিয় দর্শক আপনারা কি বুঝতে পারছেন। আসল গন্ডগোল আমাদের ইসলামে বা কোরআন হাদিসে নয় বরং এগুলো নতুন করে যারা উপস্থাপন করছে তাদের মধ্যে ও আমাদের কোরআন হাদিস সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান থাকার কারণে।
আর যদি কথা আসে, বিএনপির সানজিদা হক তুলির। তাহলে তিনি কি ভুল করেছেন। অবশ্যও ভুল করেছেন। তিনি না বুঝে ইসলামের নামে কটুক্তি করেছেন। কিন্তু তিনি যে নাস্তিক হয়ে গেছেন এটা সঠিক নয়। তিনি যদি আল্লাহ কে বিশ্বাস না করেন সাথে কোরআনের যেকোনো আয়াত বিশ্বাস না করেন তাহলে তিনি নাস্তিক হবে।
কিন্তু যদি সে, এ বিষয়ে গভীর জ্ঞান না থাকার কারণে বা অন্যের শোনা কথা থেকে এমনটা বলে থাকে কিন্তু আল্লাহ ও কোরআন এখনো বিশ্বাস করেন তাহলে তিনি একজন মুসলিম। কিন্তু মনে রাখবেন মুমিন নন। মুসলিম ও মুমিনের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।





